পবিত্র কুরআন থেকে চয়নকৃত নবী ও রাসূলগণের দো‘আসমূহ [৪৫টি]

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভূলবেন না
রহমান রহীম মহান আল্লাহর নামে শুরু-
সংকলন: এম.এ. ইমরান | উত্স: ছহীহ কিতাবুদ দো‘আ, মোঃ নূরুল ইসলাম

১। সন্তানাদি ও আবাসস্থল নিরাপদের জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বিজ‘আল হা-যা বালাদান্ আ-মিনাওঁ ওয়ারঝুক্ব আহলাহূ মিনাছছমারা-তি মান আ-মানা মিনহুম বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি।
অর্থ: ‘পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তির স্থান কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও ক্বিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস করে তাদেরকে ফলমূল দ্বারা রিযিক দান কর’ (বাক্বারাহ ১২৬)।

উত্স: ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁর শিশুসন্তান ইসমাঈলকে ও তাঁর স্ত্রী হাযেরাকে জনমানবশূন্য প্রান্তর বর্তমান কা‘বা ঘর ও যমযম কূপের সন্নিকটে রেখে আসেন, তখন উক্ত দো‘আ করেন। যাতে করে এই জনমানবহীন মরুপ্রান্তর নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য একটি শান্তির শহরে পরিণত হয়, যাতে এখানে বসবাস করা আতংকজনক না হয় এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়। শহরটি যেন হত্যা, লুণ্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ হয়। ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আর ফলেই আল্লাহ তা‘আলা মক্কাকে সম্মানিত ও নিরাপদ রেখেছেন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে দিয়েছেন। [ইবনু কাছীর, তাফসীর আল-কুরআনুল আযীম, পৃঃ ২২৬; বুখারী হা/৩১২২।]

২। দো‘আ কবূলের জন্য একান্ত নিবেদন :

উচ্চারণ: রাববানা তাক্বাববাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল ‘আলীম। ওয়াতুব ‘আলায়না, ইন্নাকা আনতাত্ তাউওয়াবুর রাহীম।  
অর্থ: ‘প্রভু হে! আমাদের নিকট থেকে এই কাজ কবূল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী ও সর্বজ্ঞ। আমাদের ক্ষমা করে দাও। নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু’ (বাক্বারাহ ১২৭-২৮)।
উত্স: ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে কা‘বা গৃহের পুন:নির্মাণ করে কা‘বা গৃহের স্থায়িত্ব কামনা এবং কুফর, শিরক, দুশ্চরিত্রতা, হিংসা, লালসা, কুপ্রবৃত্তি, অহংকার ইত্যাদি কলুষ থেকে কা‘বা গৃহকে পবিত্র রাখার জন্য উক্ত দো‘আ করেছিলেন। সেই সাথে তাদের এই ত্যাগ কবুল করার নিবেদন করেছিলেন। [ইবনু কাছীর, বুখারী হা/৩১২২।] 

৩। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করা ও জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা আ-তিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা ‘আযা-বান্না-র।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর’ (বাক্বারাহ ২০১)।

উত্স: মুমিনদের প্রার্থনা পার্থিব কল্যাণের সাথে পরকালের কল্যাণ কামনা করা। আর কাফেরদের প্রার্থনা শুধু পার্থিব। আল্লাহ তা‘আলা এখানে মুমিনদের প্রার্থনার স্বরূপ শিক্ষা দিয়েছেন।
আমল: কা‘বা ঘর তাওয়াফের সময় এই দো‘আ পড়া ভাল। তাছাড়া মুমিন ব্যক্তি সর্বদা এই দো‘আ পাঠ করবে। ছালাতে সালাম ফিরানোর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উক্ত দো‘আ পাঠ করতেন। [বুখারী হা/২৬৬৮।]

৪। ভুল-ভ্রান্তিবশত: কোন কাজ হয়ে গেলে তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করার দো‘আ:

উচ্চারণ: রাববানা লা-তুআ-খিযনা ইন্নাসীনা আও আখত্বা’ না।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দায়ী করো না যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি’ (বাক্বারাহ ২৮৬)।

৫। কোন কাজ সহজ হওয়া ও কাজ সম্পাদনে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা চাওয়া এবং বরকত চাওয়ার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা ওয়ালা তাহমিল ‘আলায়না ইছরান কামা হামালতাহূ ‘আলাল্লাযীনা মিন ক্বাব্লিনা রাববানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মা-লা ত্বা-ক্বাতালানা বিহী, ওয়া‘ফু ‘আন্না ওয়াগফির লানা ওয়ারহামনা আনতা মাওলা-না ফানছুরনা ‘আলাল ক্বাওমিল কা-ফিরীন।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপর ভারী ও কঠিন কাজের বোঝা অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর অর্পণ করেছিলে। হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর এমন কঠিন দায়িত্ব দিও না যা সম্পাদন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের প্রভু! সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর’ (বাক্বারাহ ২৮৬)।

আমল: ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলায় সূরা বাক্বারাহ্র শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে তা তার জন্য যথেষ্ট’। [মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২১২৫।]

৬। নিজেকে সত্ পথে কায়েম রাখার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা লা-তুঝিগ্ ক্বুলূবানা বা‘দা ইয্ হাদায়তানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রাহমাতা, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহা-ব।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করো না, তোমার নিকট থেকে আমাদের প্রতি রহমত দান কর। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর দাতা’ (আলে ইমরান ৮)।

গুরুত্ব ও আমল: পথ প্রদর্শন ও পথভ্রষ্টতা আল্লাহ্র পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার অন্তরকে সত্ কাজের দিকে আকৃষ্ট করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার অন্তরকে সোজা পথ থেকে বিচ্যুত করে দেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সত্ পথে কায়েম রাখেন। যখন ইচ্ছা সত্ পথ থেকে বিচ্যুত করেন। কাজেই উক্ত দো‘আ সব সময় পাঠ করা উচিত।

৭। গোনাহ মাফ ও জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা ইন্নানা আ-মান্না ফাগফিরলানা যুনূবানা ওয়া ক্বিনা ‘আযা-বান্না-র।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই আমরা ঈমান এনেছি, কাজেই আমাদের গোনাহ সমূহ ক্ষমা করে দাও। আর আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর’ (আলে ইমরান ১৬)।

গুরুত্ব: মানবকুল সাধারণত: নারী, সন্তান-সন্ততি, স্বর্ণ-রৌপ্য, গবাদি পশু ইত্যাদি আকর্ষণীয় ক্ষেত-খামারের প্রতি মোহগ্রস্ত। এসব হল পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্ত্ত। আর আখেরাতে আল্লাহ্র নিকটে আছে উক্ত ধন-সম্পদের চেয়েও উত্তম উপভোগ্য স্থান জান্নাত। তাই শয়তানের প্রলোভনে যখনই কেউ আখেরাত ভুলে পাপ কাজে লিপ্ত হবে তখনই উক্ত দো‘আ পড়বে।

৮। নেক সন্তান কামনা করে দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বি হাবলী মিল্লাদুনকা যুররিইয়াতান ত্বাইয়েবাতান, ইন্নাকা সামী‘উদ দো‘আ-ই।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! তোমার নিকট থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান কর। নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা কবুলকারী’ (আলে ইমরান ৩৮)।

উত্স: যাকারিয়া (আঃ) বার্ধক্য পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন আল্লাহ তা‘আলা ফলের মওসুম ছাড়াই মরিয়ম (আঃ)-কে ফল দান করে রিযিকের ব্যবস্থা করেন। তখন তাঁর মনে সন্তানের সুপ্ত আকাংখা জেগে উঠলো, তিনি সাহস পেলেন যে, আল্লাহ বৃদ্ধ দম্পতিকেও সন্তান দিতে পারেন। তাই তিনি আল্লাহ্র দরবারে উক্ত দো‘আ করেন। সন্তান হওয়ার জন্য দো‘আ করা পয়গম্বরগণের সুন্নাত (আলে ইমরান ৩৭-৪১)।

৯। রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যের উপর অটল থাকার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা আ-মান্না বিমা আনঝালতা ওয়াত তাবা‘নার রাসূলা ফাক্তুবনা মা‘আশ্ শা-হিদীন্।
অর্থ: ‘প্রভু হে! আমরা সে বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যা তুমি অবতীর্ণ করেছ। আর আমরা রাসূলের প্রতি অনুগত হয়েছি। অতএব আমাদেরকে মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নাও’ (আলে ইমরান ৫৩)।

উত্স: ঈসা (আঃ) যখন মানুষের অবিশ্বাস ও বিরোধিতা লক্ষ্য করলেন, তখন সাহায্যকারীদের আহবান করলেন। হাওয়ারীগণ তার সাহায্যে এগিয়ে আসলেন। তাদের ঈমানের দৃঢ়তা, আনুগত্য এবং রাসূলের প্রতি বিশ্বাস যাতে বেশী হয় তার জন্য উক্ত দো‘আ করেছিলেন। [ইবনু কাছীর, কুরতুবী।]

১০। জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার জন্য এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা মা খালাক্বতা হা-যা বা-ত্বিলান, সুবহা-নাকা ফাক্বিনা ‘আযা-বান্না-র। রাববানা ইন্নাকা মান তুদখিলিন্না-রা ফাক্বাদ্ আখঝাইতাহূ, ওয়া মা- লিযযা-লিমীনা মিন্ আনছা-র। রাববানা ইন্নানা সামি‘না মুনা-দিআই ইউনা-দী লিল ঈমা-নি আন আ-মিনূ বিরাবিবকুম ফা আ-মান্না, রাববানা ফাগফিরলানা যুনূবানা ওয়া কাফফির ‘আন্না-সাইয়েআ-তিনা ওয়া তাওয়াফফানা মা‘আল আবরা-র।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। পবিত্রতা তোমারই জন্য। আমাদেরকে তুমি জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচাও। হে প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি যাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর তাকে অপমানিত কর। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের প্রভু! আমরা ঈমান আনার জন্য একজন আহবানকারীকে আহবান করতে শুনে ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদের সকল গোনাহ মাফ করে দাও। আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দাও। আর নেক লোকদের সাথে আমাদের মৃত্যু দাও’ (আলে ইমরান ১৯১-৯৩)।

উত্স: আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি ও সৃষ্টি জগতের উপর চিন্তা-গবেষণা করে তার মাহাত্ম্য ও কুদরত সম্পর্কে অবগত হওয়া একটি মহত্ ইবাদত। এতে গভীর মনোনিবেশ করে শিক্ষা গ্রহণ না করা চরম নির্বুদ্ধিতা। এসব সৃষ্টির পিছনে হাযারো তাত্পর্য নিহিত রয়েছে। সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা না করে বেপরোয়া হয়ে যেন জাহান্নামে যেতে না হয়, তার জন্য প্রার্থনা করা ঈমানদারগণের কর্তব্য। ঈমানদারগণ যাতে আল্লাহ্র সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি পায়, হাশরের ময়দানে লাঞ্ছিত না হয় এবং ঈমানদারদের সাথে মৃত্যু হয় তার জন্য আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনার জন্য আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন।
আমল: তাহাজ্জুদ ছালাতের জন্য রাত্রে উঠে উক্ত আয়াতগুলো সহ সূরা আলে ইমরানের শেষ পর্যন্ত পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এভাবেই পড়তেন। [মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৫।]

১১। আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করার পাপ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকূনান্না মিনাল খা-সিরীন্।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (আ‘রাফ ২৩)।

উত্স: আদম ও হাওয়া (আঃ) যখন শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আস্বাদন করলেন, তখন আল্লাহ পাক অসন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিলেন। ফলে তাঁরা উভয়ই উক্ত প্রার্থনা করে ক্ষমা চাইলেন। সুতরাং ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমরা দুনিয়ার লোভে নানা ভুল করে আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করছি। তাই সদা-সর্বদা আমাদের উক্ত দো‘আ পাঠ করা উচিত।

১২। অসত্সঙ্গ ত্যাগ করা ও যালিমদের অন্তর্ভুক্ত যাতে না হয় তার জন্য প্রার্থনা :

উচ্চারণ: রাববানা লা তাজ‘আলনা মা‘আল ক্বাওমিয্ যা-লিমীন।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে যালিমদের সাথী করো না’ (আ‘রাফ ৪৭)।

১৩। নিজের ও ভাইয়ের জন্য ক্ষমা চেয়ে দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বিগ ফিরনী ওয়ালি আখী ওয়া আদখিলনা ফী রাহমাতিকা, ওয়া আন্তা আরহামুর রা-হিমীন।
অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করো এবং আমাদেরকে তোমার রহমতের অন্তর্ভুক্ত করো। তুমি তো সর্বাধিক দয়াময়’ (আ‘রাফ ১৫১)।

উত্স: মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে তাঁর ভাই হারূণ (আঃ)-এর দায়িত্বে রেখে ত্রিশ দিনের জন্য তূর পাহাড়ে গেলেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো দশ দিন বাড়িয়ে দিয়ে চল্লিশ দিন করলেন। এদিকে মূসা (আঃ)-এর অনুসারীরা তাঁর আসা বিলম্ব দেখে পথভ্রষ্ট ‘সামেরীর’ গো-বত্স পূজায় লিপ্ত হয়। হারূণ (আঃ) তাদের বাধা দিলে তার উপর ক্ষিপ্ত হয় এবং তাঁকে উপেক্ষা করে। মূসা (আঃ) ফিরে এসে কওমের ভ্রষ্টতায় ভাইয়ের উপর রাগান্বিত হন। এতে নিজ ও ভাইয়ের ত্রুটি মনে করে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

১৪। যালিমের যুলুম থেকে বাঁচার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা লা- তাজ‘আলনা ফিতনাতাল্ লিল্ ক্বাওমিয্ যা-লিমীন। ওয়া নাজজিনা বিরাহমাতিকা মিনাল ক্বাওমিল কা-ফিরীন।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর এ যালেম কওমের শক্তি পরীক্ষা করো না। আর এই কাফেরদের কবল থেকে তোমার অনুগ্রহে আমাদের মুক্ত করো’ (ইউনুস ৮৫-৮৬)।

উত্স: মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারী যারা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনেছিল তাদের উপর ফেরাঊন চরম অত্যাচার শুরু করেছিল এবং ফেরাঊনের ভয়ে অনেকেই মনে মনে ঈমান আনলেও প্রকাশ্যে ঈমান আনয়ন করেনি। তারা মূসা (আ:)-এর আবেদনে আল্লাহ্র উপর দৃঢ় ভরসা করে এবং ফেরাঊনের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উক্ত প্রার্থনা করলে আল্লাহ মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করেন। আর ফেরাঊনকে নীল নদে ডুবিয়ে মারেন। [ইবনু কাছীর, ত্ব-হা ৭৭, ৭৮ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।]

১৫। অবৈধ ও নিষিদ্ধ বিষয়ের কামনা করলে যে পাপ হয়, তা ক্ষমার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাবিব ইন্নী আ‘ঊযুবিকা আন্ আস্আলাকা মা-লাইসা লী বিহী ‘ইলমুন্, ওয়া ইল্লা তাগফিরলী ওয়া তারহামনী আকুম্ মিনাল খা-সিরীন।
অর্থ: ‘প্রভু হে! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে চাওয়া থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো, দয়া না করো তাহ’লে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (হূদ ৪৭)।

উত্স: নূহ (আ:)-এর প্লাবনের সময় তিনি অনুগত ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তি ও প্রাণীকে নৌকায় তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ছেলে পিতার আহবানে সাড়া না দিয়ে দূরে সরে গেলে এক তরঙ্গ এসে তাকে ডুবিয়ে দিল। তখন নূহ (আঃ) আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ আমার পুত্রতো আমার পরিবারভূক্ত। আল্লাহ্ বলেন, নূহ! যে তোমার কথা মানে না সে তোমার সন্তান নয়। নূহ (আঃ) তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে উক্ত দো‘আর মাধ্যমে ক্ষমা চেয়েছিলেন। [ইবনু কাছীর, হূদ ৪০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।]

১৬। নিজে ও সন্তানাদিকে শির্ক থেকে বাঁচার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাবিবজ‘আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাওঁ ওয়াজনুবনী ওয়া বানিইয়যা আন্না‘বুদাল আছনা-ম।
অর্থ: ‘হে প্রভু! এই শহরকে শান্তিময় করে দাও এবং আমাকে ও আমার সন্তানাদিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ’ (ইবরাহীম ৩৫)।

উত্স: যখন মক্কা নগরী জনবসতিপূর্ণ হয়ে গেল, বালুকাময় ভূমি ফলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, অধিক সুখ শান্তি হওয়ার কারণে জনগণ আল্লাহকে ভুলে গেল এবং জোরহাম গোত্রের লোকেরা মূর্তিপূজা আরম্ভ করে দিল তখন ইবরাহীম (আঃ) তাদের বুঝালেন যে, আল্লাহ্র বিভিন্ন নে‘মতর যেমন চন্দ্র-সূর্য, পানি-সমুদ্র, গাছ মিষ্টি ফল সব আল্লাহ্র দান। সুতরাং তাঁর ইবাদত করা, শুকরিয়া আদায় করা যরূরী। কিন্তু লোকেরা যখন এতে কর্ণপাত করল না, তখন ইবরাহীম (আঃ) উক্ত দো‘আ করলেন। তাঁর দো‘আ কবুল হওয়ার ফলে মক্কা থেকে মূর্তিপূজা দূর হ’ল এবং মক্কা নগরী আল্লাহ্র নে‘মতে পরিপূর্ণ হয়ে শান্তির নগরীতে পরিণত হ’ল। [বুখারী; ইবনু কাছীর, বাক্বারাহ ১২৬, ইবরাহীম ৩৫-৩৬ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।]
আমল: আমাদের দেশের শান্তির জন্য এবং আমাদের সন্তানাদির জন্য উক্ত দো‘আ করা কর্তব্য।

১৭। সন্তানাদি সহ নিজে মুছল্লী হওয়া এবং পিতা-মাতা সহ সমস্ত মুসলিম ব্যক্তির জন্য দো‘আ (ইবরাহীম আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: রাবিবজ‘আলনী মুক্বীমাছ ছালা-তি ওয়া মিন্ যুররিইয়াতী, রাববানা ওয়া তাক্বাববাল্ দু‘আ। রাববানাগফিরলী ওয়া লিওয়া-লিদাইয়যা ওয়া লিলমুমিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল্ হিসা-ব।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে ছালাত কায়েমকারী করুন এবং আমাদের সন্তানাদিকেও। হে আমাদের প্রভু! আমাদের দো‘আ কবুল করুন। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন যেদিন হিসাব কায়েম হবে’ (ইবরাহীম ৪০-৪১)।

উত্স: ইবরাহীম (আঃ) বায়তুল্লাহ্র পুনঃসংস্কারের পর সবাইকে মুছল্লী হওয়ার জন্য আল্লাহ্র কাছে দো‘আ করেন। নিজের জন্য ও সন্তানদের জন্য মিনতি সহকারে দো‘আ কবুল হওয়ার আবেদন করেন। মহা হাশরের দিনে যাতে নিজে, নিজের পিতা-মাতা, সমস্ত বিশ্বের মুমিনগণ ক্ষমা পায় তার জন্য উক্তভাবে দো‘আ করেন।

১৮। শত্রুর শত্রুতা থেকে বাঁচার ও রাষ্ট্রীয় সাহায্য পাওয়ার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বি আদখিলনী মুদখালা ছিদক্বিওঁ ওয়া আখরিজনী মুখরাজা ছিদক্বিওঁ ওয়াজ ‘আল্লী মিল্লাদুনকা সুলত্বা-নান নাছী-রা।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমাকে দাখিল করুন সত্যরূপে, বের করুন সত্যরূপে এবং দান করুন আমাকে নিজের নিকট থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য’ (বানী ইসরাঈল ৮০)।

উত্স: হিজরতের সময় আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এই দো‘আ শিক্ষা দেন। মক্কা থেকে বহির্গমন ও মদীনায় পৌঁছা উভয়টি উত্তমভাবে ও নিরাপদে সম্পন্ন হোক। এই দো‘আর ফলে হিজরতের সময় পশ্চাদগামীদের কবল থেকে তাকে নিরাপদে রেখেছিলেন। ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জানতেন শত্রুদের চগান্তজালের মধ্যে অবস্থান করে রিসালাতের কর্তব্য পালন সাধ্যাতীত ব্যাপার, তাই তিনি আল্লাহ্র দরবারে রাষ্ট্রীয় সাহায্যের জন্য উক্ত দো‘আ করেন। [ইবনু কাছীর, বানী ইসরাঈল ৮০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।]

১৯। কোন কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য আল্লাহ্র রহমত প্রার্থনা করে দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা আ-তিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাওঁ ওয়া হাইয়যিই লানা মিন আমরিনা রাশাদা।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে আপনার নিকট থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে সম্পূর্ণ করার তাওফীক্ব দান করুন’ (কাহ্ফ ১০)।

উত্স: উক্ত আবেদনগুলো আছহাফে কাহফের। গুহাবাসীগণ যখন বাদশার অত্যাচারে সমাজ ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নিচ্ছিলেন তখন যেন তারা আল্লাহ্র হুকুম সঠিকভাবে পালন করতে পারেন সেকারণ উক্ত দো‘আ করেছিলেন। [বনু কাছীর, কাহফ ১০ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।]
কোন কাজ আরম্ভ করার প্রথমে উক্ত দো‘আ করা যায়।

২০। জিহ্বার জড়তা দূর করার দো‘আ (মূসা আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: রাব্বিশরাহলী ছাদরী ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী ওয়াহলুল্ ‘উক্বদাতাম্ মিল্লিসা-নী, ইয়াফক্বাহূ ক্বাওলী।
অর্থ: ‘হে আমার প্রভু! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও। আমার করণীয় কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও। আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দাও, যেন তারা আমার কথা বুঝতে পারে’ (ত্বা-হা ২৫-২৮)।

উত্স: মূসা (আঃ) ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে যাওয়ার সময় উক্ত দো‘আ পাঠ করেছিলেন।

২১। রোগ মুক্তির দো‘আ (আইউব আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: রাব্বি আন্নী মাসসানিইয়ায্ যুররু ওয়া আন্তা আরহামুর রা-হিমীন।
অর্থ: ‘হে আমার প্রভু! আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি, তুমিই তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু’ (আম্বিয়া ৮৩)।

উত্স: আইউব (আঃ) দূরারোগ্য ব্যধিতে আগান্ত হ’লে তাঁর বন্ধু-বান্ধব, সন্তান-সন্ততি সবাই দূরে সরে যায়। অসুস্থতার পূর্বে তাঁকে আল্লাহ অগাধ ধন-সম্পদ, সহায়-সম্পত্তি, দালান-কোঠা, যানবাহন, চাকর-নকর সবই দান করেছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর সবকিছুই তার শেষ হয়ে যায়। এই অসহায় অবস্থায় তিনি উক্ত দো‘আ করেছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে পূর্বের ন্যায় সব কিছুই ফিরিয়ে দেন। [মা‘আরেফুল কোরআন, ইবনে কাসীর, তাফসীরে, কুরআনিল আযীম।]

২২। বিপদ থেকে মুক্তির জন্য দো‘আ (ইউনুস আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: লা ইলা-হা ইল্লা আন্তা সুবহা-নাকা, ইন্নী কুন্তু মিনায্ যা-লিমীন।
অর্থ: ‘(হে আল্লাহ) তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ মহাপবিত্র, নিশ্চয়ই আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি’ (আম্বিয়া ৮৭)।

বিশ্লেষণ: তাফসীরে ইবনে কাছীরে উদ্ধৃত হয়েছে যে, আল্লাহ রাববুল আলামীন ইউনুস (আঃ)-কে মুসেলের নিনওয়াবাসীদের হেদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিনি তাদেরকে দীর্ঘদিন ঈমান ও সত্কর্মের জন্য দাওয়াত দেন। কিন্তু তারা অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। ইউনুস (আঃ) তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ্র নির্দেশ ছাড়াই অন্যত্র চলে যান। আল্লাহ তার এই কাজ অপসন্দ করেন। ফলে আল্লাহ্র অসন্তোষে তাকে সমুদ্রে মাছের পেটে থাকতে হয়। পানির নীচে মাছের অন্ধকার পেটে এই বিপদে পড়ে ইউনুস (আঃ) উক্ত দো‘আ পাঠ করেছিলেন এবং মুক্তিও পেয়েছিলেন। যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি বিপদে পড়ে এই দো‘আ পাঠ করেন আল্লাহ তা কবুল করবেন।

২৩। সোধ ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বি আ‘ঊযুবিকা মিন্ হামাঝা-তিশ্ শাইয়া-ত্বীন। ওয়া আ‘ঊযুবিকা রাবিব আইঁ ইয়াহযুরূন।
অর্থ: ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আমার প্রভু! আমার নিকট তাদের উপস্থিতি থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ (মুমিনূন ৯৭-৯৮)।

আমল: আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য উক্ত আয়াতের মাধ্যমে দো‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, শয়তান সব কাজে সর্বাবস্থায় মানুষের কাছে আসে এবং সব সময় অন্তরকে পাপ কাজে প্ররোচনা দিতে থাকে। ঐ প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য এই দো‘আটি শিখানো হয়েছে।

২৪। পিতা-মাতার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাবিবর হামহুমা কামা রাববাইয়া-নী ছাগীরা।
অর্থ: ‘হে আমার প্রভু! তাদের (পিতা-মাতা) উভয়ের প্রতি তুমি রহম কর যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’ (বানী ইসরাঈল ২৪)।

পিতা-মাতার ষোলআনা সুখ-শান্তি বিধান মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী দেখার সাথে সাথে তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দো‘আ করবে।

২৫। আল্লাহ্র রহমত কামনা ও ক্ষমা চাওয়ার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা আ-মান্না ফাগফির্ লানা ওয়ারহামনা ওয়া আন্তা খাইরুর রা-হিমীন।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি রহম কর। তুমিতো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’ (মুমিনূন ১০৯)।

বিশ্লেষণ: সূরা মুমিনূনের সর্বশেষ আয়াতগুলো খুবই ফযীলতপূর্ণ ও বরকতময়। আল্লাহ্র রহমতে প্রত্যেক উদ্দিষ্ট ও কাম্য বস্ত্ত অর্জিত হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত রেখেছেন। আর মাগফিরাত কামনায় ক্ষতিকর বস্ত্ত দূর করাকে অন্তর্ভুক্ত রেখেছেন। [ইবনে কাছীর।] উক্ত দো‘আ প্রত্যেক মুমিনের ইহকাল ও পরকালের জন্য খুবই উপকারী।

২৬। নিজ স্ত্রী ও সন্তানাদির জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানা হাবলানা মিন আঝওয়া-জিনা ওয়া যুররিইয়া-তিনা ক্বররাতা আ‘ইউনিওঁ ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাক্বীনা ইমা-মা।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাক্বীদের জন্য আদর্শ স্বরূপ কর’ (ফুরক্বান ৭৪)।

বিশ্লেষণ: আল্লাহ্র প্রিয় বান্দাগণ কেবল নিজেদের সত্কর্ম ও সংশোধন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন না; বরং তাদের সন্তানাদি ও স্ত্রীদের আমল সংশোধন ও আমল উন্নত করার চেষ্টা করেন। আল্লাহ উক্ত আয়াত দ্বারা গোটা পরিবার উন্নত করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু উন্নত করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই প্রত্যেক কাজেই আল্লাহর উপর ভরসা করে তার কাছে সাহায্য চাওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

২৭। শুকরিয়া আদায়ের দো‘আ (সুলায়মান আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: রাব্বি আওঝি‘নী আন্ আশকুরা নি‘মাতাকা-ল্লাতী আন্‘আমতা ‘আলাইয়্যা ওয়া ‘আলা ওয়া-লিদাইয়যা ওয়া আন আ‘মালা ছা-লিহান্ তারযা-হু ওয়া আদখিলনী বিরাহমাতিকা ফী ‘ইবা-দিকাছ ছা-লিহীন।
অর্থ: ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে যে নে‘মত তুমি দান করেছ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শক্তি দান কর। আর আমি যাতে তোমার পসন্দনীয় সত্কর্ম করতে পারি এবং আমাকে তোমার অনুগ্রহে তোমার সত্কর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর’ (নামল ১৯)।

উত্স : সুলায়মান (আঃ) তাঁর সেনাবাহিনী জিন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে সমবেত করে সেনা পরিচালনা করে পিপীলিকা অধ্যুষিত এলাকায় পৌঁছলে তিনি শুনতে পেলেন, পিপীলিকাদের সরদার সবাইকে ডেকে বলছে, তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর। অন্যথা সুলায়মান ও তাঁর সেনাবাহিনীর অজ্ঞাতসারে তোমরা তাদের পদপিষ্ট হ’তে পার। সুলায়মান (আঃ) উক্ত কথা শুনে মুচকি হাসলেন ও আল্লাহ্র নে‘মতের শুকরগুজার করতে উক্ত বাক্যগুলো দ্বারা দো‘আ করেন। [ইবনে কাছীর, নামল ১৬-১৯ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।]
সুতরাং আমাদের উপর কোন নে‘মত আসলে আমাদেরও শুকরিয়া আদায় করা দরকার।

২৮। মুমিন বান্দার ক্ষমার জন্য আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের দো‘আ:

উচ্চারণ: রাববানা ওয়াসি‘তা কুল্লা শাইয়ির রাহমাতাওঁ ওয়া ‘ইলমান্ ফাগফির লিল্লাযীনা তা-বূ ওয়াত্তাবা‘ঊ সাবীলাকা ওয়াক্বিহিম্ ‘আযা-বাল্ জাহীম। রাববানা ওয়া আদখিলহুম জান্না-তি ‘আদনিনিল্লাতী ওয়া‘আত্তাহুম ওয়া মান ছালাহা মিন আ-বা-ইহিম ওয়া আঝওয়াজিহিম ওয়া যুররিইয়যা-তিহিম্, ইন্নাকা আনতাল ‘আঝীঝুল্ হাকীম্।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তোমার রহমত ও জ্ঞান সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব যারা তওবা করে এবং তোমার পথে চলে তাদের ক্ষমা করো এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। হে আমাদের পালনকর্তা! আর তাদেরকে দাখিল করো চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা তুমি তাদেরকে দিয়েছ। আর তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সত্কর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয়ই তুমি পরাগমশালী ও প্রজ্ঞাময়’ (মুমিন ৭-৮)।

২৯। যানবাহনে বসে পাঠ করার দো‘আ (রাসূলুল্লাহ ছাঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: সুবহা-নাল্লাযী সাখখারা লানা হা-যা ওয়া মা কুন্না লাহূ মুক্বরিনীন। ওয়া ইন্না ইলা রাবিবনা লামুনক্বালিবূন।
অর্থ: ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। আমরা বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমরা অবশ্যই আমাদের পালনকর্তার দিকে ফিরে যাবো’ (যুখরুফ ১৩-১৪)।

আমল: রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি সওয়ারীতে বসার সময় এই দো‘আ পাঠ করতেন। উক্ত দো‘আ পশু ও যান্ত্রিক যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুমিনের উচিত সফরের সময় পরকালীন কঠিন সফরের কথা স্মরণ করা, যা অবশ্যই সংঘটিত হবে।

৩০। নৌকা ও জাহাজ ইত্যাদি জলযানে আরোহণের দো‘আ (নূহ আঃ-এর দো‘আ) :

উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি মাজরে-হা ওয়া মুরসা-হা ইন্না রাববী লাগাফূরুর রাহীম।
অর্থ: ‘আল্লাহ্র নামেই এর গতি ও স্থিতি, আমার পালনকর্তা অতি ক্ষমাপরায়ণ মেহেরবান’ (হূদ ৪১)।

উত্স: নূহ (আঃ)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, বেঈমান কাফির বাদ দিয়ে আপনার পরিবারবর্গ ও ঈমানদারদের নৌকায় তুলে নিন। নূহ (আঃ) তাই করলেন। তখন বন্যা এসে গেল তিনি উক্ত দো‘আ পাঠ করে জাহাজ ছাড়লেন। আমরাও জলযানে আরোহণ করলে উক্ত দো‘আ পাঠ করতে পারি।

৩১। সন্তানাদি, পিতা-মাতা ও নিজে আল্লাহ্র নে‘মতের শুকরিয়া আদায় করা ও সত্ কর্মপরায়ণ হওয়ার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাব্বি আওযি‘নী আন্ আশকুরা নি‘মাতিকাল্লাতী আন‘আমতা ‘আলাইয়যা ওয়া ‘আলা ওয়া-লিদাইয়যা ওয়া আন আ‘মালা ছা-লিহান্ তারযা-হু ওয়া আছলিহলী ফী যুররিইয়যাতী, ইন্নী তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নী মিনাল মুসলিমীন।
অর্থ: ‘হে আমার প্রভু! আমাকে শক্তি দাও যাতে আমি তোমার নে‘মতের শোকর আদায় করি। যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পসন্দনীয় সত্কর্ম করি। আমার পিতা-মাতাকে সত্কর্ম পরায়ণ করো, আর সন্তানদেরকেও সত্কর্মপরায়ণ করো। আমি তোমার প্রতি তওবা করলাম। আমি তোমার একান্ত একজন আজ্ঞাবহ’ (আল আহক্বা-ফ ১৫)।

৩২। জ্ঞান, ইলম ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধির জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: রাবিব ঝিদনী ‘ইলমা
অর্থ: ‘হে প্রভু! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও’ (ত্বা-হা ১১৪)।

৩৩। হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার দো‘আ :

উচ্চারণ: রাববানাগফির লানা ওয়া লিইখ্ওয়া- নিনাল্লাযীনা সাবাক্বুনা বিল ঈমা-নি ওয়ালা তাজ‘আল ফী ক্বুলূবিনা গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ রাববানা ইন্নাকা রাঊফুর রাহীম্।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে ও আমাদের আগে যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষমা কর, ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে প্রভু! নিশ্চয়ই তুমি দয়ালু পরম করুণাময়’ (হাশর ১০)।

আমল: আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা উক্ত দো‘আর মাধ্যমে সকল মুসলমানকে ছাহাবায়ে কেরামের জন্য ইস্তেগফার ও দো‘আ করার আদেশ দিয়েছেন।

৩৪। কাফেরদের উপর বিজয়ের জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা :

উচ্চারণ: রাববানাগফির লানা যুনূবানা ওয়া ইসরা-ফানা ফী আমরিনা ওয়া ছাবিবত আক্বদা-মানা ওয়ান্ছুরনা আলাল্ ক্বাওমিল কা-ফিরীন।
অর্থ: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের পাপগুলো মোচন করে দাও, আর আমাদের কাজে যতটুকু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে তাও মোচন করে দাও। আমাদেরকে দৃঢ় রাখ এবং কাফেরদের উপর আমাদেরকে সাহায্য কর’ (আলে ইমরান ১৪৭)।

বিশ্লেষণ: ওহোদ যুদ্ধের সময় গনীমতের মাল সংগ্রহ করতে গিয়ে মুসলমানদের উপর যে সাময়িক বিপর্যয় নেমে এসেছিল তা যে মুসলমানদের একটু বাড়াবাড়ি ছিল তা বুঝতে পেরে ছাহাবীগণ আল্লাহ্র দরবারে আকুল প্রার্থনা করার জন্য আল্লাহ উক্ত দো‘আ শিক্ষা দিয়েছিলেন। সুতরাং আমাদেরও উক্ত দো‘আ করা কর্তব্য।

৩৫। ফিতনা-ফাসাদ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা :

উচ্চারণ: রাববানা ‘আলাইকা তাওয়াক্কালনা ওয়া ইলাইকা আনাবনা ওয়া ইলাইকাল মাছীর। রাববানা লা-তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফিরলানা রাববানা ইন্নাকা আন্তাল্ ‘আঝীঝুল হাকীম।
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! আমরা তোমার উপরই ভরসা করেছি, তোমার দিকেই মুখ করেছি এবং তোমার দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদেরকে কাফেরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদের ক্ষমা কর, নিশ্চয়ই তুমি মহা শক্তিধর ও প্রজ্ঞাময়’ (মুমতাহিনা ৪-৫)।

বিশ্লেষণ: এটি ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আ। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তোমাদের উপকারের জন্য আল্লাহ্র কাছে আমার কিছু করার নেই। ইবরাহীম (আঃ) বিপদে পড়লেন। একদিকে কাফের আত্মীয়-স্বজনের মায়া আর অপরদিকে ইসলামের মুহাববত। এটা যেন তার মনে ফিতনা সৃষ্টি না করে তাই উক্ত প্রার্থনা করেছিলেন।

৩৬। আয়াতুল কুরসী :

উচ্চারণ: আল্লা-হু লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইউল্ ক্বাইয়ূম, লা-তা’খুযুহূ সিনাতুওঁ ওয়ালা নাউম লাহূ মা-ফিস সামাওয়া-তি ওয়ামা ফিল আরযি, মান যাল্লাযী ইয়াশফা‘উ ‘ইনদাহূ ইল্লা বিইযনিহী, ইয়া‘লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম ওয়ালা ইউহীত্বূনা বিশাইয়িম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা- বিমা-শা-আ, ওয়াসি‘আ কুরসিইউহুস্ সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযা, ওয়ালা-ইয়াঊদুহূ হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল ‘আলিইউল ‘আযীম।
অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন প্রকৃত উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সব কিছুই তাঁর। কে আছে এমন যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? দৃষ্টির সামনে ও পিছনে যা কিছু রয়েছে সবই তিনি জানেন। মানুষ ও সমস্ত সৃষ্টির জ্ঞান আল্লাহ্র জ্ঞানের কোন একটি অংশবিশেষকেও পরিবেষ্টন করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে যতটুকু ইচ্ছা দান করেন তিনি ততটুকু পান। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীন পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলো ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ ও সর্বাপেক্ষা মহান’ (বাক্বারাহ ২৫৫)।

আমল ও ফযীলত: উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ্র একক অস্তিত্ব, তাওহীদ ও গুণাবলীর বর্ণনা এক অত্যাশ্চর্য ও অনুপম ভঙ্গিতে করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এটিকে সবচেয়ে উত্তম আয়াত বলে উল্লেখ করেছেন। নাসাঈ শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী করীম (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেহ ফরয ছালাতের পর আয়াতুল কুরসী নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য বেহেশতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু বাধা দিতে পারে না। [নাসাঈ, ইবনু হিববান, সনদ ছহীহ, বুলূগুল মারাম হা/৩২২।] শয়ন কালে পাঠ করলে সারা রাত্রীতে একজন ফেরেশতা তাকে পাহারা দিবে যাতে শয়তান তার ক্ষতি করতে না পারে।

৩৭। বিপদে ও মুছীবতে পড়লে দো‘আ :

উচ্চারণ: ইন্না লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জি‘ঊন।
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহ্র জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর সান্নিধ্যে ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ১৫৬)।

আমল: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা করেন। তিনি ভয়, ক্ষুধা, মাল, সন্তান-সন্ততি, ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করেন। যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হ’লো যখন তার উপর বিপদ নেমে আসে তখন সে ধৈর্যধারণ করে উক্ত দো‘আ পাঠ করে।
এ দো‘আ পাঠ করলে একদিকে যেমন অসীম ছওয়াব পাওয়া যায় তেমন অর্থের দিকে খেয়াল করে পাঠ করলে বিপদে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং তা থেকে উত্তরণ সহজ হয়।

৩৮। শত্রুর উপর বিজয়ী হওয়ার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ: ক্বুলিল্লা-হুম্মা মা-লিকাল মুলকি তু’তিল মুলকা মান তাশা-উ ওয়া তানঝি‘উল মুলকা মিমমান তাশা-উ, ওয়া তু‘ইঝঝু মান তাশা-উ ওয়া তুযিললু মান্ তাশা-উ, বি ইয়াদিকাল খাইর, ইন্নাকা ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। তূলিজুল্ লাইলা ফিন্নাহা-রি ওয়া তূলিজুন্ নাহা-রা ফিল্লাইল, ওয়াতুখরিজুল হাইয়যা মিনাল মাইয়যিতি ওয়া তুখরিজুল মাইয়যিতা মিনাল হাইয়যি, ওয়া তারঝুক্বু মান তাশা-উ বিগাইরি হিসা-ব।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর, যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও। আর যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর, যাকে ইচ্ছা অপমান কর। তোমার হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল। তুমি রাতকে দিনের ভিতর প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের ভিতর প্রবেশ করাও। আর তুমি জীবিতকে মৃতের ভিতর থেকে বের কর এবং মৃতকে জীবিতের ভিতর থেকে বের কর। আর তুমি যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান কর’ (আলে ইমরান ২৬-২৭)।

৩৯। বালা-মুছীবত ও মহামারির সময় পিতা-মাতা ও মুমিনদের রক্ষার জন্য ও যালিমদের ধ্বংসের জন্য নূহ (আঃ)-এর দো‘আ :

উচ্চারণ : রাব্বিগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মুমিনান ওয়ালিল মুমিনীনা ওয়াল মুমিনা-তে ওয়ালা তাযিদিযয-লিমীনা ইল্লা তাবা-রা।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন, আর যে ব্যক্তি আমার বাড়ীতে মুমিন অবস্থায় প্রবেশ করবে তাকে ক্ষমা করুন এবং সকল মুমিন নর-নারীকে ক্ষমা করুন। আর যালিমদের ধ্বংস বৃদ্ধি করুন’ (নূহ ২৮)।

৪০। নিজ বংশে সত্ সন্তান প্রার্থনা করে দো‘আ :

উচ্চারণ : রাব্বানা তাক্বাববাল মিন্না ইন্নাকা আন্তাস সামীঊল আলীম, রাববানা ওয়াজ‘আলনা মুসলিমাইনে লাকা ওয়া মিন জুর্রিয়যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়াতুব আলাইনা ইন্নাকা আনতাত তাউওয়া-বুর রাহীম।
অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী ও সর্বজ্ঞ। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের দুইজনকে আপনার অনুগত মুসলিম বানিয়ে নিন এবং আমাদের বংশধর থেকে একটি অনুগত দল তৈরী করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু’ (বাক্বারাহ ১২৭-১২৮)।

আমল : ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে কা‘বা গৃহের পুনঃনির্মাণ করে কা‘বা গৃহের স্থায়ীত্ব কামনা, কুফর ও শিরক বিমুক্ত জাতি তৈরীর উদ্দেশ্যে তাঁর বংশে যাতে দ্বীনদার ব্যক্তির আর্বিভাব হয় সে জন্য দো‘আ করেন। তাঁর দো‘আর ফলেই তাঁর বংশে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্ম হয়। আমরাও আমাদের বংশে যাতে ভাল লোক তৈরী হয় তার জন্য উক্ত আয়াত দ্বারা দো‘আ করতে পারি।

৪১। প্রজ্ঞা ও হিকমত বৃদ্ধির জন্য এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা :

উচ্চারণ : রাব্বি হাবলী হুকমাও ওয়া আলহিক্নী বিছছা-লিহীন। ওয়াজ‘আল লী লিসানা ছিদকিন ফিল আ-খিরীন। ওয়াজ‘আলনী মিওঁ ওয়ারাছাতি জান্নাতিন নাঈম।
অর্থ : ‘হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে হিকমত দান করুন এবং সত্ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আখেরাতে আমাকে সত্যবাদীদের সাথী করুন এবং আমাকে নাঈম নামক জান্নাতের উত্তরাধিকারী করুন’ (শু‘আরা ৮৩-৮৫)।

৪২। সত্ কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত থেকে প্রকৃত মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ : ফাতিরাসসামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযি, আনতা ওয়ালিয়ইয়ী ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আ-খেরাহ। তাওয়াফফানী মুসলিমাওঁ ওয়া আলহিকনী বিছছা-লিহীন।
অর্থ : ‘(হে আল্লাহ!) আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, ইহকাল ও পরকালে আপনি আমার অভিভাবক। অতএব আমাকে মুসলিম করে মৃত্যু দান করুন এবং সত্কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন’ (ইউসুফ ১০১)।

উত্স : ইউসুফ (আঃ) কারাগার থেকে বের হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পেয়ে পিতা-মাতা ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করে যখন জীবনে শান্তি ফিরে পেলেন তখন সরাসরি আল্লাহ্র প্রশংসা, গুণাবলী বর্ণনা করত ও দো‘আয় মশগূল হয়ে উক্ত দো‘আগুলি করেন। ঈমানের সাথে মৃত্যু কামনা করে আমাদেরও উক্ত দো‘আ করা যাবে।

৪৩। যালিম স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য আসিয়ার দো‘আ :

উচ্চারণ : রবিববনি লী ইনদাকা বায়তান ফিল জান্নাতি ওয়া নাজ্জীনি মিন ফির‘আওনা ওয়া আমালিহি ওয়া নাজ্জিনী মিনাল কাওমিযয-লিমীন (তাহরীম ১১)।

উত্স : মূসা (আঃ)-এর সাথে ফেরাউনের জাদুকর পরাজিত হলে আসিয়া আল্লাহর উপর ঈমান আনেন। নিজ স্ত্রীর ঈমানের খবর শুনে ফেরাঊন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আসিয়াকে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে। মৃত্যুর পূর্বে বিবি আসিয়া আল্লাহ্র কাছে উক্ত প্রার্থনা করেন।

৪৪। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সম্মুখে দৃঢ় থাকার ও মনোবল বৃদ্ধি, বিজয় প্রার্থনা করে তালূত বাহিনীর দো‘আ :

উচ্চারণ : রববানা আফরিগ্ আলাইনা ছাবরাও ও ছাবিবত আক্বদা-মানা ওয়ানছুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরিন (বাক্বারাহ ২৫০)।
অর্থ : ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাদের ধৈর্য দান কর! আমাদেরকে দৃঢ় পদে রাখ এবং আমাদেরকে তুমি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য কর’ (বাক্বারাহ ২৫০)।

উত্স : আমালেকা সম্প্রদায়ের বাদশা জালূত বনী ইসরাঈলের সেনাপতি তালূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তালূত আশি হাযার সৈন্য নিয়ে জালূতের বিরুদ্ধে রওয়ানা হয়। আল্লাহ পাক সৈন্যদের পরীক্ষা করার জন্য পানি না পান করে একটি নদী পার হওয়ার ঘোষণা দেন। যারা পানি পান করবে না তারাই মুমিন। কিন্তু দেখা গেল ৮০ হাযারের মধ্যে মাত্র ৩১৩ জন পানি পান করেনি। ঐ ৩১৩ জন মুমিন সৈন্য জালুতের বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহ্র সাহায্য চেয়ে উক্ত দো‘আ করেছিলেন। আল্লাহ তার দো‘আ কবুল করেছিলেন। তাই বিশাল শক্তিধর জালূত পরাজিত হয়েছিল।

৪৫। পাপ ক্ষমা করে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য দো‘আ :

উচ্চারণ : রাব্বানা ইন্নানা আমান্না ফাগফিরলানা জুনূবানা, ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার।
অর্থ : হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি সুতরাং তুমি আমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দাও এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হ’তে রক্ষা কর’ (আলে ইমরান ১৮)।

কুরআনের কতিপয় আয়াতের জওয়াব:


  1. ‘সাবিবহিসমা রাবিবকাল আ‘লা’-এর জওয়াবে বলতে হয়- ‘সুবহা-না রাবিবয়াল আ‘লা’ (আমি আমার উচ্চ মর্যাদাবান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি)। [আহমাদ, আবূদাঊদ, মিশকাত হা/৭৯৯।]
  2. সূরা আল-ক্বিয়ামাহ-এর শেষে জওয়াবে বলতে হয়- ‘সুবহা-নাকা ফা বালা’ (হে আল্লাহ! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, হ্যাঁ তুমি মৃতদেরকে জীবিত করতে সক্ষম)। [বায়হাক্বী, আবুদাঊদ হা/৮৮৪।]
  3. ‘ফাবি আইয়যি আ-লা-ই রাবিবকুমা-তুকাযযিবা-ন’-এর জওয়াবে বলতে হয়- ‘লা-বিশাইয়িম মিন নি‘আমিকা রাববানা-নুকাযযিবু ফালাকাল হামদ’ (প্রভু হে! আমরা তোমার কোন নি‘আমতকেই অস্বীকার করি না, তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা)। [তিরমিযী, মিশকাত হা/৮০১।]
  4. সূরা আল-গাশিয়াহর শেষে জওয়াবে বলতে হয়- ‘আল্লা-হুম্মা হা-সিবনী হিসা-বাই ইয়াসীরা’ (হে আল্লাহ! আমার নিকট হতে সহজ হিসাব নিও)। [আহমাদ, মিশকাত হা/৫৩২৭।] উল্লেখ্য, এটি শুধু সূরা গাশিয়ার সাথেই নির্দিষ্ট নয়। বরং ছালাতের মধ্যে যেখানেই হিসাব সংগান্ত আলোচনা আসবে সেখানেই পড়া যাবে।

Post Your Comment

Thanks for your comment