কুর’আনের দিকে প্রত্যাবর্তন

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে- 

লেখকঃ মনসূর আহমেদ | অনুবাদকঃ মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ
নিঃসন্দেহে কুর’আনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু আশ্চর্যের কথা হল আমারা বলতে গেলে তা ভুলে যাই।
আমাদের কুর’আনকে গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি আমার কাছে একটি তত্ত্বীয় ব্যাপার বলে মনে হয়। আর এক্ষেত্রে তত্ত্বটি হলঃ মানুষ স্বভাবতই বিতর্ক প্রিয়। পক্ষান্তরে, কুর’আনের জ্ঞান সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ফলে যা হয় তা হল মানুষ বিতর্কহীন কুর’আনের প্রতি বেশী সময় ধরে আগ্রহ ধরে রাখতে পারেনা। কারণ, আগেই বলেছি, স্বভাবগতভাবেই মানুষ বিতর্ক করতে ভালবাসে।
ঈদের চাঁদ দেখা কিংবা কুরবানীর জবেহকৃত পশুর গোশত বণ্টন ইত্যাদি বিষয়গুলোর পক্ষে-বিপক্ষে আমরা বিতর্কে লিপ্ত হয়ে থাকি। কারণ এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছুটা হলেও পুঁথিগত বিদ্যার প্রয়োজন যে বিদ্যা জাহির করে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করার একটা সুবর্ণ সুযোগ থাকে। আর প্রতিপক্ষের কুপোকাত হওয়াটা আমাদেরকে এক সস্তা মানসিক আত্মপ্রসাদ দান করে যা নিয়েই আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকি। কুর’আনে কিন্তু এমন বিতর্ক নেই, কারণ বাস্তবে কি কেউ তাজবীদ (কুরআন তেলাওয়াতের নিয়ম-কানুন) বা কিরা’আত (কুর’আন তেলাওয়াতের শিল্প) এমন অতি ক্ষুদ্র বিষয়ে তর্ক করে?
আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন কুর’আন আল-কারীমে বলছেন যে নাবী মুহাম্মাদ (সা) তাঁর উম্মাহ্‌ তথা আমাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করবেন। তিনি (সা) এই অভিযোগ করবেন না যে তাঁর (সা) উম্মাহ্‌ ৮ রাকা’আতের স্থলে ২০ রাকা’আত বা ১০ রাকা’আতের স্থলে ৮ রাকা’আত সলাত আদায় করেছে, বরং তাঁর (সা) অভিযোগ হবে এই যে তারা (আমরা) প্রতি ক্ষেত্রেই কুর’আনকে পরিত্যাগ করে আমাদের কাজকর্ম সম্পাদন করেছি।
“রাসূল (সা) বললেনঃ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কুর’আনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।” [সূরা আল-ফুরকান; ২৫:৩০]
আসুন, বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভাবা যাক। কুর’আনের সাথে আমাদের সম্পর্ক কিসের? হৃদয়ের সর্বোচ্চ স্থানে না রেখে কুর’আনকে কি আমরা গৃহের দামী বুক শেলফের সর্বোচ্চ তাকে সাজিয়ে রেখেছি? তাকে কি আমরা সারাবছর তুলে রাখি শুধু রমজানে না বুঝে তেলাওয়াত করার জন্য? শুদ্ধ উচ্চারনে এবং তাজবীদ সহকারে কি কুর’আন পড়তে পারি আমরা? কখনো কি কুর’আন পড়ে বোঝার চেষ্টা করি এই অভ্রান্ত সত্যের কিতাব আমাদের কি করতে বলে? কেন আমাদের আত্মিক বা দৈনন্দিন জীবনে কুর’আনের কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না?
প্রথমে যা বলছিলাম-আমরা বিতর্ক পছন্দ করি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন বিতর্ক শুধু তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে যেখানে মাথা ঘামানোর মত আরো অনেক জটিল বিষয় পড়ে আছে? আর বিতর্ক যদি হয় ধর্মের কোন মৌলিক বিষয় নিয়ে তাহলে কেন আমরা কুর’আন থেকে সে বিষয়ের সমাধান পাওয়ার চেষ্টা করিনা? আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ
“এবং আল্লাহ্‌র রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে থাক আর কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আল-ইমরান; ৩:১০৩]
প্রসিদ্ধ তাফসীরসমূহ অনুসারে এ আয়াতে “আল্লাহ্‌র রজ্জু” হল কুর’আন আল-কারীম। কুর’আন আমাদেরকে সবসময়ই একটি বড় বিষয় মনে করিয়ে দেয়; আর তা হল কিয়ামত। কিন্তু কেন?
কেননা, তারাবীতে কত রাকা’আত সলাত আদায় করেছেন তার চেয়ে কিভাবে আদায় করেছেন সেটাই মুখ্য বিষয়। মসজিদে বৃহষ্পতি নাকি শুক্রবার ঈদ পালন করা হল সেটার চাইতে আগের একমাসে কেমন ইবাদত করেছেন সেটাই মুখ্য বিষয়। বিষয়টা আসলে আল্লাহ্‌, তাঁর কিতাব কুর’আন আল-কারীম এবং তাঁর প্রিয় নাবীর (সা) সাথে আমাদের হৃদয়ের টান, হৃদয়ের সম্পর্কের সাথে সংশ্লিষ্ট।
তবে এমনটি মনে করা মোটেই ঠিক হবেনা যে, কুর’আনের নির্ধারিত হুকুম-আহকামের তোয়াক্কা না করেই আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের সাথে আত্মিক সম্পর্ক উন্নয়নের কাজে লেগে যাব। আর বাস্তবেও সেটা কখনই সম্ভব নয়। আমাদের উচিৎ হল সঠিক উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে থাকা। একবার এ ভারসাম্যে পৌছে গেলে তার স্বাভাবিক ফল হচ্ছে তখন কোন বিতর্কিত বিষয়গুলো মুসলিম উম্মাহ্‌র মাঝে কোন বিভেদ সৃষ্টিকারী প্রভাব ফেলতে পারবেনা।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কখনই কোন বিতর্ক হয়না আর সেগুলো নিয়ে বিতর্ক করাও আমাদের কাজ নয়। তবে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক বা মতানৈক্য হয়ে থাকে সেগুলো যদি কোনভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয় তারপরও গৌণ বিষয়গুলোকে টেনে হিঁচড়ে এতোদূর নিয়ে যাওয়া মোটেই উচিৎ নয় যাতে করে মুসলিম উম্মাহ্‌র ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

আত্মিক উন্নয়নে কুরআনের ভুমিকা

“সত্যিকার অর্থে পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হলে আমাদের প্রতিপালকের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়ার ব্যাপারে আমরা কখনই বাড়াবাড়ি করতাম না; কুরআন না পড়ে একটি দিনও কাটুক এমনটি ভাবতেই আমার ঘৃণা হয়।

তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বর্তমান সময়ে একটি অনেক বড় সমস্যা যা মুসলিম উম্মাহ্‌কে চরমভাবে ভুগাচ্ছে। অথচ বিষয়গুলো নিয়ে কোন সমস্যা হবার কথা ছিলনা। এহেন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো জটিল পরিস্থিতিরই এক পূর্বাভাস দেয়। আর এসব অনর্থের মুলে হল আমাদের আত্মিক পরিশুদ্ধতার দেউলিয়ত্ব। বিশেষ করে ঈমান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেউ বিতর্কে লিপ্ত হলে বুঝতে হবে এটা  তার একটা আত্মিক ব্যাধি যা তাকে খামাখা বিতর্কে লিপ্ত করে রাখে। এতে করে ব্যক্তি তার প্রতিপক্ষকে ভুল প্রমাণের মাধ্যমে এক অকৃত্রিম আত্মতৃপ্তি লাভ করে; প্রতিপক্ষকে যুক্তির বাণে ঘায়েল করে নিজের পাশবিক আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করে। এমন ধরনের তর্ক-বিতর্ককে শয়তান মানুষের সম্মুখে আরো সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে ফলে একজন মনে করে অন্যজন ভুল পথে আছে আর সে তাকে সঠিক পথে নিয়ে আসার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে অনেক মহান একটি কাজ করছে।
এহেন আচরণ পারস্পারিক অবজ্ঞা আর মানসিক বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে। ফলে মানুষে মানুষে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। অথচ কুর’আনের শিক্ষা হল এমন আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত। আসল কথা হল কুর’আনের সাথে আমাদের সম্পর্কের অবনতির কারনেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে; আর কুর’আনও ঠিক একই কথা বলে। কুর’আন আল-কারীমে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ
হে মানব জাতি! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের তরফ হতে সমাগত হয়েছে এক নসিহত এবং অন্তরসমূহের সকল রোগের আরোগ্যকারী, আর মুমিনদের জন্যে পথ প্রদর্শক ও রহমত। [সূরা ইউনুস; ১০:৫৭]
আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কুর’আন না মেনে কোন উপায় নেই; কুর’আনই আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় এই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন; কুর’আনের মাধ্যমেই আমরা এই পার্থিব জীবনের নশ্বরতা, আমাদের শেষ পরিণতি তথা মৃত্যু তারপর পুনরুত্থান, বিচার দিবস, জান্নাত ও জাহান্নামের ইত্যাদির কথা  স্মরণ করে থাকি। এই কুর’আন আমাদের জীবনের প্রতিটি বিষয়কে করে রেখেছে সুসংহত এবং সুসমন্বিত। যা একজন মু’মিনের জন্য আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আসা অনুগ্রহ শুধুই অনুগ্রহ। অনুগ্রহ মু’মিনের জন্য কখনো অভিশাপ হয়ে আসতে পারে না। এজন্য খলীফা উসমান ইবনে আফফান (রা) বলেনঃ
“সত্যিকার অর্থে পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হলে আমাদের প্রতিপালকের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়ার ব্যাপারে আমরা কখনই বাড়াবাড়ি করতাম না; কুর’আন না পড়ে একটি দিনও কাটুক এমনটি ভাবতেই আমার ঘৃণা হয়।”
কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের উচিৎ জীবনের প্রতিটি পরতেই কুর’আনকে আঁকড়ে ধারণ করা এবং এমনসব কুতর্ক এড়িয়ে চলা যা কোনভাবেই আমাদের জন্যে কোন প্রকারের কল্যাণ বয়ে আনেনা। প্রকৃতঅর্থেই, কুর’আন হল আমাদের আত্মার খোরাক-এটা আমাদের আত্মার পুষ্টি সাধন করে থাকে; আমাদের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং সর্বোপরি, এটা আমাদের পারলৌকিক জীবনের সাথে সেতু বন্ধন তৈরি করে। পৃথিবীর মাটি থেকেই আমাদের দেহ সৃষ্ট আর এ পৃথিবীতেই আল্লাহ্‌ আমাদের বেঁচে থাকার উপাদান মজুত রেখেছেন। যা কিছুই আমরা খাই তা কোনো না কোনোভাবে মাটি থেকেই উৎপন্ন। আমাদের আত্মা এসেছে আল্লাহ্‌র নিকট থেকে, তাই এর বেঁচে থাকার উপাদান আল্লাহ্‌ পাঠিয়েছেন রূহের জগত থেকে। এজন্য কুর’আনের সংস্পর্শে হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে। পক্ষান্তরে, কুর’আন থেকে দূরে সরে গেলে আমাদের হৃদয় তথা আত্মার অপমৃত্যু ঘটে।
আল্লামা হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহিমাহুল্লাহ্‌) বলেনঃ
“কুর’আন মেনে চলা, আল্লাহ্‌র প্রতি নিভৃতেও বিনয়ী হওয়া ও পাপ পরিত্যাগ করার উপর নির্ভর করে হৃদয়ের বেঁচে থাকা।”
 খাদ্যের অভাবে শরীর যেমন উপোস থাকে ঠিক তেমনি করে কুর’আন থেকে দূরে সরে গেলে মানুষের আত্মাও অভুক্ত থাকে; ফলে জীবন হয়ে ওঠে এক দুঃসহ যন্ত্রণার আঁধার। আর এভাবেই আত্মা তখন তর্ক-বিতর্কের মাঝে তার খোরাক খুঁজে পেতে চেষ্টা করে।

কুর’আনের নির্দেশনাকে গুরুত্ব না দেয়া, কুর’আনের হুকুম মেনে না চলা, কুর’আনকে হেদায়াতের উৎস হিসেবে বিবেচনা না করা, আত্মিক উন্নতি এবং হৃদয়ের অসুখ সারানোর জন্যে কুর’আনকে নিরাময় হিসেবে গ্রহণ না করা ইত্যাদি সবই হল কুর’আন পরিত্যাগ করার সমতুল্য। আল্লামা হাফিজ ইবনুল কায়্যুম (রহিমাহুল্লাহ্‌) এর মতে, উল্লেখিত বিষয়গুলোর সবকটিই নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা স্পষ্ট যেখানে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
রাসূল (সা) বললেনঃ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে। [সূরা আল-ফুরকান; ২৫:৩০]
আমরা লক্ষ্য করলে দেখি যে, কুর’আনের যেখানেই কোন কিছু করার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেখানেই উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহ্‌ভীতির কথা না হয় জান্নাত-জাহান্নামের কথা। তবে যা করতে বলা হয়েছে তা করাটাই যথেষ্ট নয়। বিধিনিষেধ মেনে চলার বিষয়গুলো আসলে আধ্যাত্মিকতা এবং আন্তরিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট। আন্তরিকতা বিবর্জিত সৎকর্মের ফলাফল শূন্য। আন্তরিকতার সাথে সৎকর্ম সম্পাদন করার মাধ্যমেই নিজের ভেতর কুর’আনের শিক্ষা বিকশিত হতে থাকে। কুর’আনের বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমেই তৈরি হয় স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক। স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের মাধ্যমেই মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় ইবাদতের তাৎপর্য তথা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের হুকুম মেনে চলার নিহিতার্থ এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের গুরুত্ব।  তাই ব্যক্তির তর্কে লিপ্ত হওয়া এটাই প্রমান করে যে, সে তার স্রষ্টার ইবাদতের ব্যপারে কতটা উদাসীন এবং আন্তরিকতা বিবর্জিত। অথচ স্রষ্টার ইবাদতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে কুর’আনের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে বিতর্ক করা থেকে দূরে রাখা।

কুর’আন প্রতিনিয়তই আমাদেরকে মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে থাকে এবং সকলের এক ও অভিন্ন লক্ষ্যের সাথে আমাদের কর্মকাণ্ডকে জুড়ে দেয়। আর সেই এক ও অভিন্ন লক্ষ্য হল চিরস্থায়ী সুখের আবাস জান্নাত অর্জন এবং অনন্ত শাস্তির আবাস জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ। আকীদাহ্‌গত এবং ফক্‌হী কিছু বিষয় আছে যেগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবে সেগুলো কখনই আমাদের পারস্পারিক সম্পর্ককে যাতে বিনষ্ট করে না দেয় সেজন্য আমাদের যত্নবান হওয়া উচিৎ।

কিভাবে কুরআনের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা সম্ভবঃ

জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বাগ্রে স্থান পাবে কুর’আন। কুর’আন শিক্ষার বিষয়টিও হতে হবে আমাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বের।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত গলদ আমাদের ভেতরের সাম্প্রদায়িক সমস্যাগুলোর মূল কারণ। এক্ষেত্রে যা মনে রাখতে হবে তা হল প্রতিটি কর্ম সম্পাদনের মত জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও একজন শিক্ষার্থীকে কিছু নির্ধারিত নিয়ম মেনে অগ্রসর হতে হবে।
জ্ঞান অন্বেষণকারী রাতারাতি বিদ্বান হয়ে উঠতে পারেনা। তাকে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়। জ্ঞান অন্বেষণের প্রথম ধাপ হওয়া চাই কুর’আন। আমরা দেখতে পাই যে, কেউ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হতে চাইলে তাকে প্রথমে মানবদেহ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করে তারপর কোন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। সে কখনো প্রথমেই সার্জারি বিষয়ক মোটা মোটা বই পড়া শুরু করেনা। ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রেও আমাদেরকে একই মান প্রয়োগ করতে হবে ও মৌলিক বিষয়ের উন্নতিতে গুরুত্বারোপ করতে হবে। শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জন বিষয়ে ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ্‌) বলেনঃ
“কাজেই শুরুই করতে হবে কুর’আন হিফয্‌ করার মাধ্যমে কারণ কুর’আন-ই হল জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা। সালাফগণ কুর’আনের হাফেজ ছাড়া অন্য কাউকে হাদীস বা ফিক্‌হী শিক্ষা দিতেন না। কুর’আন হিফয্‌ হয়ে গেলে ছাত্রের হাদীস, ফিকহ্‌ বিষয়ক শিক্ষা আরাম্ভ করতে হবে এবং এ বিষয়ে ছাত্রকে সজাগ করে দিতে হবে যাতে হাদীস এবং ফিকহ্‌ পড়তে গিয়ে কুর’আনের কোন অংশ ভুলে না যায়।” (Introduction toal-majomoo’ Sharh ul- Muhadhhab (১/৩৮)
এটাই হল সে পথ যা শ্রেষ্ঠ মনীষী ও বিদ্যার্থীগণ অনুসরণ করেছেন- তারা হাদীস বা ফিক্‌হী শিক্ষায় নিজেদের ব্যাপৃত করার পূর্বে কুর’আনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন; আকীদার বিষয়গুলোকে অনেক কমগুরুত্ব দিয়েছেন যেখানে আমরা এর বিপরীতটাই করে থাকি। আমরা যে জ্ঞানান্বেষণ একেবারেই বাদ দিয়েছি আসল বিষয় তা নয়; বরং আমাদের উচিৎ ধর্মের বিভিন্ন জ্ঞানের ভুমিকাকে প্রকৃত গুরুত্বারোপ করা, যাতে করে  আগ্রহ নিয়ে আমরা যা শিখতে চাই তা এবং ধর্মের মূল হিসেবে আমাদের যা শিখতে হয় তার মাঝে আমরা ভারসাম্য আনতে পারি; অর্থাৎ, জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে আমরা কুর’আনকে অগ্রাধিকার দেয় ও শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম স্থানে রাখি। নাবী কারীম (সা) বলেনঃ
“জ্ঞানীর সাথে প্রতিযোগিতা করা বা মূর্খের সাথে তর্ক করা কিংবা মজলিসে জ্ঞান জাহির করার জন্য জ্ঞানার্জন করো না, যে এটা করে তার জন্য আগুন, তার জন্য আগুন।” (ইবনে মাজাহ)
ইসলামের সব কিছুর উৎসই হচ্ছে কুর’আন। এই কিতাব যা তৈরি করেছে সাহাবাগণকে, তাদের চরিত্র নির্মান করেছে, তাদের এমন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে যে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন তাদেরকে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটা যে কারনে হয়েছে তা হচ্ছে কুর’আনের সাথে তাদের সম্পর্ক, রাতে তেলাওয়াত আর দিনে তা কর্মে পরিণত করা, এর সার্বজনীনতা উপলব্ধি ও তার প্রয়োগ যা তাদেরকে ঐরূপ বানিয়েছে। নাবী কারীম (সা) তাদের কুর’আনের সাথে গ্রথিত ও সম্পর্কযুক্ত করেছেন যা কেবল তেলাওয়াতের মধ্যেই সীমিত ছিল না, এটা এমন কিছু ছিল যা তাদের বিনয়ী ও সেরাদের সেরা বানিয়েছে।
ঠিক তাদের মত করে আমরা কুর’আনকে গুরুত্ব দেয়া, হিফয করা, তেলাওয়াত করা, শ্রবণ করা ও উপলব্ধি করার চেষ্টা শুরু করতে পারি। আমরা এমন সময়ে আছি যখন এ ধরণের জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ সহজ সাধ্য- প্রয়োজন শুধু শিক্ষার্থীর ন্যূনতম প্রচেষ্টা। তথাপি, ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের হাতের নাগালে প্রাপ্ত জ্ঞানের এ বিশাল সমারোহের মাঝে আমাদের জীবনে জ্ঞানের যে সত্যিকার ভুমিকা থাকার কথা-অর্থাৎ ব্যক্তি, তার পরিবার, সামাজিক ক্ষেত্র ও জনসমাজের জন্য ভালোর উৎস তা আমরা অবজ্ঞা করতে পারিনা।
প্রকৃত পক্ষে, যারা আল্লাহ্‌র কিতাব তেলাওয়াত করে, সলাত প্রতিষ্ঠা করে ও তাদের যা দান করা হয়েছে তা হতে প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করে, তারাই আশা করতে পারে তাঁদের এমন ব্যবসায়ের যার ক্ষয় নেই। এ জন্যে যে, আল্লাহ্‌ তাঁদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে আরো বেশী দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী।(সূরা ফাতির; ৩৫:২৯-৩০)
আল্লাহ আমাদের সকলকে কুর’আন অর্থসহকারে নিয়মিত তিলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন। আমীন!

Post Your Comment

Thanks for your comment